
ছাতকের সংবাদ ডেক্স :
ছাতকে এখন চোখে–আঙুল দিয়ে দেখার মতো বাস্তবতা—নলকূপে নেই পানির শব্দ, খালে নেই স্রোত, নদীতে নেই গতি। চারদিকে শুকনো মাটি, ফেটে যাওয়া জমি আর তৃষ্ণায় মানুষের হাহাকার। এমন তীব্র পানিসংকট এর আগে দেখেননি বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এক লক্ষাধিক মানুষ আজ খাবার পানির সংকটে ভুগছেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীন তাপদাহে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২০০ থেকে ৩০০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ফলে উপজেলার প্রায় ১৮ হাজার নলকূপের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি নলকূপে পানি উঠছে না। হাতে চাপা নলকূপগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অনেক গভীর নলকূপেও (যাতাকল) পানি মিলছে না। বর্ষাকালে সচল থাকলেও হেমন্ত ও শীত মৌসুমে সেগুলো শুকিয়ে যায়।
গ্রামাঞ্চলে পানির জন্য দীর্ঘ লাইন
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বালতি–কলস হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে নারী ও শিশুদের। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনছেন অনেকে। বৃদ্ধরা লাঠি ঠেকিয়ে কষ্টে কষ্টে হাঁটছেন পানির সন্ধানে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে সামান্য পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে মানুষকে।
পানির অভাবে অনেকেই দূষিত পানি পান করছেন। ফলে ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। মৃতপ্রায় নদী, মরা খাল ও ভরাট পুকুরের কারণে বিকল্প পানির উৎসও নেই।
গভীর নলকূপ স্থাপনে অনিয়মের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক সরকারি গভীর নলকূপ খোলা প্রান্তরের পরিবর্তে ব্যক্তি মালিকানাধীন আঙিনায় বসানো হয়েছে। এতে একটি বা দু’টি পরিবার সুবিধা পেলেও সাধারণ মানুষ পানি পাচ্ছেন না। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী ও সাবেক দলীয় নেতাকর্মীদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু নলকূপ, যা গরিব মানুষের কাজে আসছে না।
জাউয়াবাজার এলাকার মুলতানপুর গ্রামের ক্বারী মাওলানা জুনায়েদ আহমদ বলেন, “১৫ বছর আগে ৫০০ ফুটে পানি পাওয়া যেত, এখন ৭০০ ফুটেও নিশ্চিত নয়। দিনে ১০–১২ বার চাপ দিলেও এক ফোঁটা পানি ওঠে না।”
ব্যবসায়ী সামছুল ইসলাম জানান, “এ বছর পরিস্থিতি চরমে। গ্রামের প্রায় সব টিউবওয়েল মরা। হাতে ব্যথা হয়ে যায়, তবু পানি ওঠে না।”
উত্তর খুরমা ইউনিয়নের গিলাছড়া গ্রামের গাড়িচালক আরজদ আলী বলেন, “অবস্থা এমন যে পুকুরের নোংরা পানি গরম করে খেয়ে বাঁচতে হচ্ছে।” গদার মহল গ্রামের চমক আলীর ভাষায়, “যাদের বাড়িতে গভীর নলকূপ আছে তারা বাইরে থেকে পানি আনতে দেয় না। পুরো গ্রাম জুড়েই হাহাকার।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সংকট
পানিসংকটে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক মিয়া জানান, “মাসখানেক ধরে স্কুলের কোনো টিউবওয়েলে পানি নেই। বাচ্চারা তৃষ্ণায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে খাল-পুকুরের পানি ফুটিয়ে খাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “এ বছরের মতো এমন সংকট ছাতকে আর দেখিনি। পানি না থাকলে পড়াশোনা চালানোও কঠিন।”
প্রশাসনের বক্তব্য
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE)–এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ ইছহাক আলী পানিসংকটের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সরকারি গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, “ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের নিচে নেমে গেছে। আগে যেখানে ৪০০ ফুটে পানি মিলত, এখন ৭০০ ফুটেও নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিনই মানুষ ফোন করে জানাচ্ছেন—টিউবওয়েলে পানি উঠছে না।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, “পানির সংকট সম্পর্কে বিস্তারিত জানা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প পানির ব্যবস্থা, নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন ও জলাশয় পুনঃখনন না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে
Leave a Reply